Skip to Content

জীবনানন্দ দাশ : একটি কবিতার পঠন

আফজাল হোসেন

এ খেলা শব্দের, অর্থের, দৃশ্যের, ইঙ্গিতের এবং হাজার হাজার বছরের। কিন্তু সে খেলা একেবারে আলোতে নয়, অন্ধকারেই। আবার একেবারে অন্ধকারে কি? 

কেননা, ‘বালির ওপর জ্যোৎøা’ তো থাকে। শুধু জ্যোৎøা নয়, জোনাকিও থাকে। এই জ্যোৎøা আর জোনাকির অন্ধকার তো কেবল অন্ধকার নয়, তা আলোরও। এই আলো নিভে-জ্বলে, জ্বলে-নিভে; অন্ধকারও আলো পায়, আলো হারায়।

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো :
চারিদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান-
বালির উপরে জ্যোৎøা- দেবদারু ছায়া ইতস্তত
বিচূর্ণ থামের মতো; দ্বারকার- দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত ¤ান
শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ আমাদের- ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন :
‘মনে আছে?’ সুধালো সে- সুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?’
মাত্র ছয় পঙ্ক্তির এ কবিতার শিরোনাম ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে।’ মনে পড়ে বছর দশেক আগে জীবনানন্দ দাশের এ কবিতাটি পড়ার এক তুমুল অভিজ্ঞতার কথা। বারবার পড়েও কবিতাটির পড়া তখন শেষ হতে চায় না। মনে হচ্ছিল, এক আলো-ছায়ার ভুতুড়ে ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে আমি যেন যাচ্ছি কোথায়। একটা ঘুম-ঘুম ভাব লেগেছিল শরীরে। অস্পষ্ট ছায়ার মতো কে যেন দূরে দাঁড়িয়ে ইশারায় আমাকে ডেকে নিয়ে চলেছে। কিন্তু কোথায় আমি জানি না। কবিতার শেষে যে প্রশ্নবোধক চিহ্নটা ঝুলে আছে, তা যে দারুণ জিজ্ঞাসায় রূপান্তরিত হয়েছিল, তাও বলা যাবে না। ওই চিহ্নটা খসে পড়েছিল এ কারণে নয় যে, কোন একটা উত্তর মিলেছিল; বরঞ্চ এ কারণে যে, উত্তর মেলে না। তখন কবিতাটা বারবার পড়ার পর কেবলই মনে হচ্ছিল, চুপ করে থাকাই তো ভালো। এও মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে যে, আমি কবিতাটির পুরোপুরি দখলে চলে গেছি। কবিতার ক্ষমতা-দখলের এও এক নমুনা বটে, যদিও একমাত্র নমুনা নয়। এবং জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতার ক্ষমতা ও ধরনেরই মনে হয়েছিল আমার, দীর্ঘসময়। মনে হয়েছিল, এই কবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দখলের রাজনীতি নিয়েও কথা বলা যায়।
বছর দশেক পরে এখন ওই একই কবির কবিতা পড়তে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে, জীবনানন্দ দাশ তার পাঠককে কবিতার ভেতর দিয়েই বুঝিয়ে দেন কবিতার ক্ষমতা এবং এমনকি পাঠককে স্বাধীন করে-দেয়ার ক্ষমতা। পশ্চিমা মুলুকে উত্তরাধুনিকতাবাদীদের একটা দল পাঠকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে এনে তার পক্ষে তুমুল ওকালতি করে চলেছেন। কেউ কেউ এমনকি লেখকের মৃত্যুও ঘোষণা করেছিলেন। সে কারণে ‘ডিসকোর্স’ যেখানে সাধ হয়তো সেখানেই চলে যেতে পারে। উত্তরাধুনিকতাবাদীদের আগেই লাতিন আমেরিকান লেখক বর্হেসও হোমারের অনুবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, যারা ‘আসল’ বা ‘একক’ হোমার অন্বেষণের তথাকথিত অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছেন, তারা আসলে একটা মায়ার পেছনেই ছুটে চলেছেন, কেননা ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো এবং বর্হেস এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, কোন ‘একক’ বা ‘আসল’ হোমার নেই, আছে ‘অসংখ্য’ হোমারÑ যা আসলে অসংখ্য পাঠকেরই অসংখ্য ডিসকোর্স। কিন্তু এও সত্য যে, হোমার এক অর্থে ছিলেন বলেই অসংখ্য হোমার থেকে যাচ্ছেন এবং আবার একইভাবে সবাই ওই উত্তরাধুনিকতাবাদী অর্থে মৃত্যুরও মুখোমুখি হতে পারে না; অর্থাৎ অজস ডিসকোর্সের, অজস পাঠকের অজস বয়ানকে সম্ভব করে তুলতে পারে না। তবে কেউ কেউ পারেন একটু বেশি, যেমন পারেন জীবনানন্দ, যার কবিতায় ‘হাজার বছর’ বা হাজার হাজার অর্থ বা ইঙ্গিত ‘খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো’। না, এটা সম্ভব হয় না প্রতিবেদনে, সাপ্তাহিকীর বা দৈনিকের খবরে, পরিসংখ্যানবিদের সারণিতেÑ সম্ভব হলেও তা ততটা সম্ভাবনাময় নয়, যতটা সে কবিতায়, কেননা কবিতার ভাষার শক্তিটাই আলাদা। অনেক কবিতার ক্ষমতা এই জায়গায় যে, সে ছুটে চলে সময়, ইতিহাস, অভিজ্ঞতার অসংখ্য পথ বেয়ে; অসংখ্য পাঠকের ভেতর দিয়ে সে চলতেই থাকে, চলতেই থাকে যেন তাকে থামানো যায় না।
দুই
এবার কবিতায় ফেরা যাক। লক্ষণীয় যে, কবিতার প্রারম্ভিক পঙ্ক্তির প্রায় মাঝখানে দু’টি শব্দ ক্রিয়ার পোশাক পরে জায়গা দখল করে আছে : ‘খেলা করে’Ñ শুধু খেলা করে। খেলাটা জীবনানন্দের প্রিয়ই বটে। কিন্তু কার খেলা?
কবিতাটি বারবার পাঠ করলে মনে হয় যে, এ খেলা শব্দের, অর্থের, দৃশ্যের, ইঙ্গিতের এবং হাজার হাজার বছরের। কিন্তু সে খেলা একেবারে আলোতে নয়, অন্ধকারেই। আবার একেবারে অন্ধকারে কি? কেননা, ‘বালির ওপর জ্যোৎøা’ তো থাকে। শুধু জ্যোৎøা নয়, জোনাকিও থাকে। এই জ্যোৎøা আর জোনাকির অন্ধকার তো কেবল অন্ধকার নয়, তা আলোরও। এই আলো নিভে-জ্বলে, জ্বলে-নিভে; অন্ধকারও আলো পায়, আলো হারায় এবং সেই উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির ক্রীড়া চলতে থাকেÑ এই ক্রীড়া হাজার বছরের বা ধরা যাক, অনন্তকালের বা অন্তহীনতার। অর্থাৎ বলা যাবে অর্থের জোনাকির কথা। হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশ এই কবিতায় আগে-ভাগেই ধরেছেন চিহ্নের অনন্তক্রীড়ার বিষয়টি। জীবনানন্দ দাশের ভাষাই আমাকে সেদিকে যাওয়ার স্বাধীনতা দিচ্ছে বৈকি। একটা নতুন টেক্সটও তৈরি হয়ে যাচ্ছে : ‘হাজার হাজার চিহ্ন খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো।’
এও লক্ষ্য না করে উপায় নেই যে, কবিতার প্রারম্ভিক পঙ্ক্তিটা পড়তে গেলে একটা ধাঁধার মুখোমুখি হতে হয়। প্রশ্ন জাগে : কে খেলা করে হাজার বছর অন্ধকারে? কে? আরেকবার পড়লেই তবে ধরা পড়ে যে, ‘হাজার হাজার বছর’ নিজেরাই খেলা করে অন্ধকারে। তবে ‘হাজার হাজার বছর’ একটা অনিশ্চিত কর্তাসত্তার চেহারা নেয়। কারণ আমাদের প্রাত্যহিক হিসাব-নিকাশের সব সীমানা পেরিয়ে চলে যায় এই ‘হাজার বছর’। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটার কালিক বিস্তৃতির অনুষঙ্গটা জাগ্রত হতে থাকে। সেই অনুষঙ্গের সঙ্গে আবার যুক্ত হয় ইতিহাস, এমনকি প্রাক-ইতিহাসও, যে-ইতিহাসের কোন লিখিত রূপ নেই, যে-ইতিহাস হেরোডোটাসকে ভেলকি দেখায়। এই ইতিহাসের সঙ্গে আবার যুক্ত হয় মিথিক্যাল সময়, যে সময় নিউটনের ঘড়িটাকে মুহূর্তেই ভেঙে ফেলে। অর্থাৎ ইতিহাস, প্রাক-ইতিহাস, মিথসহ সময়ের সব স্তর খেলা করতে পারে জোনাকির মতোÑএকবার জ্বলে ওঠে, আরেকবার নিভে গিয়ে এবং এও লক্ষণীয় যে, এখানে নিরঙ্কুশ উপস্থিতির বা অনুপস্থিতির কোন অবকাশ নেই।
কিন্তু অন্ধকারটা কি স্থির? কেননা অন্ধকারই তো ধারণ করছে সব সময়ের বা চিহ্নের (কালিক চিহ্নের) খেলাকে। আবার দেখা যাচ্ছে যে, কবিতার দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটি বলছেÑ ‘চারদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান।’ শুধু রাত্রিই নয়, ‘রাত্রির নিধান।’ অন্ধকারের সঙ্গে রাত্রির সরাসরি যোগাযোগ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় আরও দু’টি বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি, অন্তত এটা মনে করার আগে যে, অন্ধকারকে জীবনানন্দ দাশ এক ধরনের সর্বগ্রাসী আধিপত্য দিয়েছেন। জীবনানন্দকে নিয়ে একটা প্রচলিত ধারণা তো রয়েই গেছে যে, তিনি অন্ধকারেরই কবিÑতিনি অন্ধকারকেই ভালোবাসেন। হ্যাঁ, এই কবিতায় অন্ধকার আছে বটে, আছে রাত্রিও, আছে রাত্রির নিধান। ‘নিধান’ শব্দটির অবশ্য একাধিক আভিধানিক অর্থ রয়েছে, যা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দেখিয়েছেন তার একটি পঠনে : ‘রাত্রির নিধান’ শব্দটির অর্থ এখানে রাত্রির নির্দেশ। ‘নিধান’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ : ১. স্থাপনা, ২. সংরক্ষণ, ৩. প্রত্যর্পণ, ৪. দান, ৫. অনুপস্থিতি ৬. কুবেরের সপ্তনিধির যে কোন একটি, ৭. ঐশ্বর্য, ৮. শস্যকোষ, ৯. ভিত্তিস্তর (বীজগণিত)।’ অবশ্য অলোকরঞ্জন নিজেই ‘রাত্রির নিধান’ শব্দজোড়ার অর্থ করেছেন ‘রাত্রির নির্দেশ’। যদি অর্থ হিসেবে উলিখিত নয়টি অর্থকে একই সঙ্গে নেই, তাহলে রাত্রির ‘উপস্থিতি’ বা ‘অনুপস্থিতি’ দুটোকেই বোঝানো সম্ভব হয়। আর ‘নির্দেশ’ হিসেবেই যদিবা নেই, তাহলে প্রশ্ন জাগে : এ নির্দেশ কি অলঙ্ঘনীয়? নাকি অনিশ্চিত? যে দু’টি বিষয় একটু আগে খেয়াল করার কথা বলেছিলাম, সেগুলো এখন খেয়াল করা যাক। প্রথমত, দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ‘চারিদিকে চিরদিন’ এবং দ্বিতীয়ত, তৃতীয় পঙ্ক্তিতে ‘জ্যোৎøার’ উলেখের কারণে রাত্রির অন্ধকারের সঙ্গে রাত্রির আলোর (এই আলো আসলে দিনেরই ধঃৎরনঁঃব) একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যে কারণে রাত্রির নির্দশের একচ্ছত্র আধিপত্য ব্যাহত হয়। আমরা পাই এমন একটা জগৎ যেখানে কোন কিছুর নির্দেশ নিরঙ্কুশ নয়: আলো আছে, আলো নেই; অন্ধকার আছে, অন্ধকার নেই। এমনকি দেবদারুও তার ছায়া নিয়ে স্থির দাঁড়াতে পারে না। সে ‘ইতস্তত,’ তৃতীয় পঙ্ক্তির ভাষিক উপাত্ত অনুসারে। ‘বালির’ যে উলেখ আছে ওই তৃতীয় পঙ্ক্তিতে, সেই বালিও ‘হাজার হাজার বছরের’ মতোই দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশকে নিমিষেই অস্বীকার করে; কেননা ‘বালি’ মানেই অসংখ্য বালুকণা, অসংখ্য চিহ্ন, অসংখ্য জোনাকি, যেগুলো আলোতে জ্বলে আর অন্ধকারে নিভে, জ্বলে-নিভে, বারবারই। এভাবে কবিতার শুরুতেই আমরা প্রবেশ করি এমন এক জগতে যেখানে কোন কিছুই স্থির ও নিশ্চিত নয়; প্রবেশ করি এমন এক জগতে যেখানে খেলা চলছে হরদম। আবারও বলা চলে, এ খেলা চিহ্নের খেলা, যে খেলার কথা কেবল পাশ্চাত্যের চিহ্নবাদী তাত্ত্বিকেরাই বলেননি, কেবল দেরিদাই উলেখ করেননি; তাদের আগেই চিহ্নের ওই খেলার কথা বলে গেছেন স্বয়ং লালন ফকির। লালনের সেই খাঁচার ভেতর চিহ্ন যায়, চিহ্ন আসে এবং কোন চিহ্নকে নিশ্চিত অর্থের হাতকড়া দিয়ে গ্রেফতার করা যায় না বলেই অর্থের অন্বেষণও অব্যাহত থাকে বৈকি।
লক্ষণীয় যে, কবিতার চতুর্থ পঙ্ক্তিতে দেবদারুর উপমা হিসেবে ব্যবহƒত ‘থাম’-এর আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তখনই, যখন কবি ব্যবহার করেন ‘বিচূর্ণ’ বিশেষণটি। ‘থামটা’ আসলে ‘থাম’ নেই; থামটা কাটা চিহ্নের নিচে পড়ে গেছে, সেটা বিশেষভাবেই চূর্ণ বৈকি। তাই থাম থাকে না, থাকে তার অবশেষ, থাকে তার ধ্বংসের চিহ্ন। সেই অর্থে থামও যে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে, তা বলা যাবে না। অর্থাৎ ‘থাকে’ এবং ‘থাকে না’, ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’, এবং ‘উপস্থিতি’ ও ‘অনুপস্থিতি’র ডায়ালেকটিকে আবর্তিত হচ্ছে চিহ্নগুলো, যেন মুছতে গেলেও মোছার চিহ্ন থাকে, আবার থাকেও না। এই অভিজ্ঞতাটাকে আরও গাঢ় করে তুলেন কবি তার কবিতার পরবর্তী পর্যায়ে, যখন তিনি বলেন, ‘দ্বারকা’র কথা। কে এই ‘দ্বারকা’? আমরা জানি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে কৃষ্ণ ফিরে এসেছিলেন দ্বারকায়, যে দ্বারকা একসময় সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই দ্বারকাই ওঠে এসেছে কবিতায় এখন। সমুদ্রের শরীরে সে তো বিলুপ্ত নয় মোটেই, আবার সে পুরোপুরি দাঁড়াতেও পারে না একজন জীবন্তমানুষের উপস্থিতির মতো। কেননা কবি তো বলেই দিচ্ছেন যে, সে ‘মৃত ও ¤ান’। থাকা ও না থাকার এ এক খেলা বটে। হ্যাঁ, খেলা চলছে হরদম।
কবির ইঙ্গিতটা এভাবে পড়া কষ্টকর নয় মোটেই যে, ইতিহাসের কোন পর্যায়ই সম্পূর্ণ অতীত নয়, আবার তা সম্পূর্ণ বর্তমানও নয়। হাজার হাজার বছর অতীত হয়ে গেছে সত্য, কিন্তু তারা তাদের চিহ্নগুলো রেখে গেছে, যা বর্তমানের গভীরে খেলা করে নিয়ত। কবির কাছে ‘বর্তমান’ কোন নিশ্চিত চৈহ্নিক বিভাজন নয়। বরঞ্চ বর্তমান ধারণ করে অতীতের চিহ্ন, যাকে অবশ্য পাঠ করা যায় কেবল অনিশ্চিতির বোধ নিয়ে। ইঙ্গিতটা এমনও যে, আমাদের সব কীর্তি, আয়োজন, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি ধ্বংস হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু থেকে যাবে ধ্বংসের দু’একটা চিহ্ন সময়ের শরীরে। সে চিহ্ন জ্বলবে জোনাকির মতোই।
কিন্তু কবিতাটির চতুর্থ পঙ্ক্তির প্রথম অংশÑ ‘শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ’Ñ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের নাম-না-জানা আবেশ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে খানিকক্ষণ। মনে হয়, আজ কিছুই করার নেই আমার; আজ সবকিছুই স্থির, কোথাও কোন উত্তেজনা নেই, নিউইয়র্ক নেই, প্যারিস নেই, ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নেই, কেননা ‘ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন।’ একটা মুহূর্তকে আয়েশে গ্রেফতার করার চেষ্টা যেন। জীবনটা ফুরিয়ে গেছে বা যাচ্ছে, অথচ এই ফুরিয়ে যাওয়াটা কী শান্তির, ঘুম ঘুমভাবের মতোই। এই মুহূর্তটা কবিতায় দপ করে জ্বলে ওঠে ঠিকই, কিন্তু আবার নিভে যায়, কেননা কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে প্রশ্ন থাকে : ‘মনে আছে?’ হ্যাঁ, কে একজন হঠাৎ হাজির হল? নাকি আলোতে অন্ধকারে কারুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল? কে সে? বনলতা সেন? লক্ষণীয় যে, স্মৃতির ওপর একটা চাপ তৈরি হচ্ছে, প্রশ্নটা থাকে বলেই জীবনের সব লেনদেন ফুরিয়ে যাওয়ার কিংবা ঘুচে যাওয়ার পরও তা ঠিক ঘুচে যাচ্ছে না। চিহ্নের অন্তহীন পথ-চলা? যাকে মুখোমুখি বসিবার ‘বনলতা সেন’ বলে ঠাওরিয়েছিলেন কবি তার ‘বনলতা সেন’ কবিতায়, সেকি এখন সংশয়ের কিংবা অস্পষ্ট স্মৃতির চিহ্ন? সেও কি ধ্বংসের বা অতীতের চিহ্ন হয়ে খেলা করে বর্তমানের ভিতরে? অসংখ্য প্রশ্নের ভেতরে এভাবেই কবিতাটি ছুটে চলে; কবিতাটির কোন শেষ পঙ্ক্তি নেই।
শেষ পঙ্ক্তি ছাড়া এমনই অসংখ্য কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ দাশ। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, কোন কবিতারই হয়তো শেষ পঙ্ক্তি থাকে না। সেটা যদি মেনে নেই, তাহলে বলা যাবে যে, জীবনানন্দ দাশ সেই অর্থেই কবি, যিনি এখনও আমাদের জন্য শেষ পঙ্ক্তিটা লিখে চলেছেন আমাদের পঠনের ভেতর দিয়ে। আর পঙ্ক্তি শেষ হতে পারে তখনই, যখন মুছে যাবে সব কবিতার লেনদেন।



Dr. Radut | blog